৩.ছোট নীল আলো- আইনুল বারী
৩.ছোট নীল আলো
আইনুল বারী
- - -
এক সময় আমরা গরীব ছিলাম
আমাদের পরনের জামাগুলো আঁটোসাটো ছিলো
জানালার পর্দা ছিলো মাপমতো, আজকের তুলনায় দেখতে বেমানান
ঘরগুলো ছিলো ছোট ছোট
জড়ো হয়ে থাকতাম আমরা ক' ভাইবোন
আমাদের ঘরে এয়ারকন্ডিশনার ছিলো না
বড় সোফা ছিলো না
কারুকার্যময়ী শো-কেস ছিলো না...
তাই আজো মনে জ্বলজ্বল করে এক বর্ণালী সুখের মতো
প্রথম যে দিন বাসায়
হারিকেনের বদলে বিদ্যুত সংযোগ হলো
অদ্ভুত সে আলো
ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলাম কী নেশায়
সব কিছু ছাপিয়ে তাই স্মৃতিতে জাগরূক আজো
প্রথম যেদিন বাসায়
সিলিং ফ্যানটি এলো
মস্তো দেয়াল ঘড়িটি এলো
রেডিও-র বদলে টিভি সেটটি এলো...
আমাদের বাসার সামনে বিরাট উঠোন ছিলো
তা ছিলো আমাদের আনন্দ-ক্যানভাস
বাইরে ছিলো বিরাট খোলা মাঠ,আদিগন্ত ভূবন যেনো
পাড়ার ছেলে মেয়েরা দল বেঁধে থাকতাম
ঘুরতাম, খেলতাম, ফুল তুলতাম,হাসিতে গড়াতাম,
প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতাম, গা ছম ছম ভূতের গল্প হতো
মায়ের কোলে দুপুড়ের গল্পে ছিলো মধুমাখা
রাত জাগা গানের আসরে ছিলো সম্মোহন...
তারপর!
যেদিন অহংকারী দামী সোফাসেটটি কেনা হলো
আর কারুকার্যময় শো-কেসও হলো
বড় একটি মেক-আপ আয়না
এরপর হিজিবিজি এটা সেটা
স্মৃতি ঝাপসা হতে শুরু করলো
একে একে আমাদের যাবতীয় সুখ
ধীরে ধীরে বিলীন হলো বিস্মৃতিতে...
প্রথম কয়েকের পর শিশু আর ছিলাম না আমরা
তাইতো তারপর
রোমাঞ্চ জ্বরের মতো কিছু আর স্পর্শ করেনি কখনো
আজ আমাদের ঘরে দারিদ্র্যের সংকোচ নেই
ঘরে নতুন কিছু আসার তুমুল আনন্দ নেই
আমাদের স্মৃতিও রইলো না
আমাদের বাসার উঠোনের বদলে বেলকনি
আমরা ক'জন শিশু-বৃদ্ধ-যুবা সীমাবদ্ধ ঝুলন্ত আঙ্গিনায়
সীমাবদ্ধ চিন্তায় নিষ্পেষিত, আড়ষ্ট
ভয়ে শংকিত,হারানোর ভয়ে জর্জরিত
মৃত মানুষের ছবি দেখতে দেখতে ক্লান্ত...
আগুনের পোড়া আতংকিত আর্ত চিৎকার
ভয়ানক নিষ্ঠুরতার সাথে পরিচিত হতে হতে
ভাবলেশহীন,মোটিফ মুখোশের আড়ালে
আহা, হারিয়েছে আমাদের সেদিনের শিশুতোষ!